বাবা মোহাম্মদ আলী ছিলেন একজন লাবণচাষি। সারা দিন কঠোর পরিশ্রম করে দুই ছেলে, পাঁচ মেয়ের মুখে তিনি বহু কষ্টে খাবার তুলে দিতেন। সাত ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট আমেনা বাবার এই কষ্ট দেখেই বড় হয়েছেন। এমন টানাটানির সংসারে টেকপাড়া আমেনা খাতুন উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং কক্সবাজার সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন তিনি। ২০০৮ সালে জীবনটা যেন হঠাৎ বড় একটা খাদের কিনারে এসে পড়ে। প্রচণ্ড পরিশ্রমে তাঁর বাবা হঠাৎ মারা যান। শত দারিদ্র্যের মধ্যেও মা–বাবা তাঁর পাশে ছিলেন এত দিন। লেখাপড়ায় উৎসাহ দিতেন। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর তাঁর পড়ালেখা প্রায় বন্ধ হওয়ার দশা। অদম্য আমেনা দমে যাননি। মানুষের বাসায় টিউশনি এবং ছোটখাটো স্বেচ্ছাসেবী কাজ করে নিজের পড়াশোনার খরচ চালিয়েছেন। সংসারের হাল ধরতে তিনি উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরি নেন। প্রতিদিন সকালে কক্সবাজার শহর থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে উখিয়ার কর্মস্থলে যেতেন এবং সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে রান্নাবান্না, নিজের লেখাপড়া ও অসুস্থ মায়ের সেবা করতেন। এভাবেই টানা চার বছর চাকরি করে অর্জিত টাকা দিয়ে মায়ের চিকিৎসা এবং নিজের পড়াশোনা চালান। এরই মধ্যে তিনি কক্সবাজার সরকারি কলেজ থেকে বাংলা বিষয়ে অনার্স সম্পন্ন করেন।কক্সবাজার পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ টেকপাড়ার আমেনা বেগমের বেড়ে ওঠার শুরুটা এমন। এই পর্যন্ত শুনে যাঁরা ভাববেন, তাঁর জীবনসংগ্রামের সবটুকু গল্প বলা হয়েছে, তবে ভুল হবে। ৩৭ বছর বয়সী এই নারীর প্রায় পুরো জীবনই কেটেছে চরম সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। পারিবারিক টানাপোড়েন, অভাব-অনটন, বৈবাহিক জীবনের চরম নির্মমতা আর শারীরিক অসুস্থতাকে জয় করে আমেনা বেগম আজ এক সফল নারী। তাঁর এই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প অবহেলিত নারীদের কাছে অনুপ্রেরণা।নিজের জীবনে লড়াই–সংগ্রামের এই স্বীকৃতি পেয়েছেন আমেনা। গত মে মাসে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরে শ্রেষ্ঠ ‘অদম্য নারী’ সম্মাননা পেয়েছেন তিনি। আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ ও বেগম রোকেয়া দিবস উপলক্ষে কক্সবাজারের আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাঁর হাতে এ সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়। সেদিন মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক সুব্রত বিশ্বাস বলেন, ‘নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করেছেন আমেনা বেগম। তাঁর এই সাফল্য সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।’কক্সবাজার পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ টেকপাড়ার আমেনা বেগমের বেড়ে ওঠার শুরুটা এমন। এই পর্যন্ত শুনে যাঁরা ভাববেন, তাঁর জীবনসংগ্রামের সবটুকু গল্প বলা হয়েছে, তবে ভুল হবে। ৩৭ বছর বয়সী এই নারীর প্রায় পুরো জীবনই কেটেছে চরম সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। পারিবারিক টানাপোড়েন, অভাব-অনটন, বৈবাহিক জীবনের চরম নির্মমতা আর শারীরিক অসুস্থতাকে জয় করে আমেনা বেগম আজ এক সফল নারী। তাঁর এই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প অবহেলিত নারীদের কাছে অনুপ্রেরণা।বৈবাহিক জীবনের অন্ধকার অধ্যায়স্নাতক পাস করে একটা উন্নয়ন সংস্থায় (এনজিও) চাকরিরত অবস্থায় আমেনার বিয়ের প্রস্তাব আসে। চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের এক নিম্নবিত্ত পরিবারে বিয়ে হয় তাঁর। চাকরি যত দিন ছিল, তত দিন শ্বশুরবাড়িতে টাকা দিয়েছেন। তবে এনজিওর প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তিনিও চাকরি হারান। আর তখন থেকেই শুরু নির্যাতন। আমেনা বেগম বলেন, ‘যত দিন আয় ছিল, সংসারের সব খরচ চালিয়েছি, তখন সবার চোখের মণি ছিলাম। চাকরি শেষ হওয়ার পর স্বামী নানা অজুহাতে নির্যাতন শুরু করেন। সন্তান না হওয়ার অজুহাতে শাশুড়ি-ননদ-দেবর—সবাই অপবাদ দিতেন।’দীর্ঘ ১১ বছরের বিবাহিত জীবনে কেবল সন্তান না হওয়ার অপবাদে তাঁর ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। দিনের পর দিন জুটেছে গালিগালাজ, বন্ধ হয়েছে খাবার ও কাপড়ের জোগান। এই চরম অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে এক পর্যায়ে আমেনা স্ট্রোক করেন। দুই মাস হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে সুস্থ হয়ে যখন শ্বশুরবাড়িতে ফেরার চেষ্টা করেন, তখন ২০২৩ সালের জুলাই মাসে তাঁকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের আগস্টে স্বামী তাঁকে তালাক দেন। ২০২৫ সালের নভেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁদের বিচ্ছেদ ঘটে।বাড়ির ছাদের অল্প জায়গাজুড়ে করেছেন রঙিন মাছের খামারনতুন জীবন শুরুতালাকের পর সালিস বৈঠকের মাধ্যমে কাবিনের দেনমোহর বাবদ এক লাখ টাকা পান আমেনা। যেখানে অনেকে এই পরিস্থিতিতে ভেঙে পড়েন, সেখানে আমেনা এই টাকা আর নিজের জমানো কিছু সঞ্চয়কে বানালেন জীবনের ‘টার্নিং পয়েন্ট’। মায়ের ভিটায় নিজের থাকার জন্য দুই কক্ষের একটি ঘর তোলেন তিনি। বাকি টাকা বিনিয়োগ করেন সম্পূর্ণ নতুন এক উদ্যোগে।শুরু করেন টিউশনি আর সমন্বিত কৃষিকাজ। বাড়ির ছাদে গড়ে তোলেন উন্নত জাতের রঙিন মাছের পোনার চাষ, যা অ্যাকুয়ারিয়ামের জন্য শহরের দোকানে বিক্রি হয়। পাশাপাশি বাড়ির আঙিনায় গড়ে তোলেন বিষমুক্ত শাকসবজির খামার। নিজের মেধা ও কঠোর পরিশ্রমের সঙ্গে যুক্ত করেন এক ভাইকে। ফলে দ্রুতই সংসারে সচ্ছলতা ফিরে আসে।বর্তমানে শহরের কয়েকটি বাড়িতে টিউশনি করে মাসে ৬ হাজার টাকা এবং মাছ বিক্রি থেকে ১০ হাজার টাকা আয় করছেন তিনি। প্রতিদিন বিকেলে নির্বাক ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী মা হাসিনা বানুকে সঙ্গে নিয়ে রঙিন মাছের পোনা পরিচর্যা করেন আমেনা।বাবার মৃত্যুর পর মায়ের চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছেন আমেনাশহরের ব্যস্ততম প্রধান সড়কের ‘শখের অ্যাকুয়ারিয়াম অ্যান্ড গিফট শপ’–এর মালিক শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘শহরে শৌখিন অ্যাকুয়ারিয়ামে রঙিন মাছ লালন-পালন অনেক বেড়েছে। আমেনা বেগমের উৎপাদিত রঙিন মাছের পোনা আমাদের চাহিদা মেটাতে দারুণ ভূমিকা রাখছে।’আমেনা বেগম কেবল নিজের ভাগ্যই বদলাননি, তিনি এখন আলো ছড়াচ্ছেন সমাজেও। নিজের খামারের লভ্যাংশ থেকে আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের সাহায্য করার পাশাপাশি আশপাশের প্রায় ১৫টি পরিবারকে তিনি সবজি চাষে উদ্বুদ্ধ করেছেন। বর্তমানে তিনি তাঁর খামারের পরিধি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন।পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আশরাফুল হুদা সিদ্দিকী বলেন, নির্যাতনের বিভীষিকাময় অতীতকে পেছনে ফেলে আমেনা বেগম আজ একজন আত্মপ্রত্যয়ী ও সফল নারী। যে সমাজ একদিন তাঁকে অবহেলা করেছে, আজ সেই সমাজই তাঁকে শ্রদ্ধার চোখে দেখে। আমেনা প্রমাণ করেছেন, আত্মবিশ্বাস ও সততা থাকলে যেকোনো অন্ধকার থেকেই আলোতে ফিরে আসা সম্ভব।
বর্তমান সময়ে আমাদের জাতীয় অর্থনীতি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটে নানামুখী পরিবর্তন ও অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে এবং বিভিন্ন খাতের উন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারি উভয় পক্ষ থেকেই বিভিন্ন যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এসব উদ্যোগ সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের সার্বিক অগ্রযাত্রা আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হবে।
বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট খাতের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশের উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। এই খাতের যথাযথ প্রসার ঘটলে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভিত্তিকে আরও বেশি শক্তিশালী করবে।
সামগ্রিক এই উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে দীর্ঘমেয়ায়ী ও টেকসই করতে হলে সংশ্লিষ্ট সকলের আন্তরিক সহযোগিতা এবং সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা অত্যন্ত জরুরি। আশা করা যাচ্ছে অদূর ভবিষ্যতে এর সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং সাধারণ মানুষ এর প্রকৃত সুফল ভোগ করবে।