আগের পর্বআইসোটোপ শব্দটির সঙ্গে তুমি ইতোমধ্যেই পরিচিত। এটা হচ্ছে সেই পদার্থ- যার পরমাণুগুলোর নিউক্লিয়াসে একই সংখ্যক প্রোটন থাকলেও নিউট্রনের সংখ্যা ভিন্ন। কিছুসংখ্যক আইসোটোপ সম্বন্ধে তুমি জানতে পেরেছ- যেমন ইউরেনিয়ামের আইসোটোপ ইউরেনিয়াম-২৩৫ এবং বোরনের আইসোটোপ বোরন-১০ এবং বোরন-১১। অধিকাংশ রাসায়নিক মৌলিক পদার্থেরই আইসোটোপ রয়েছে এবং এর মধ্যে কিছুসংখ্যক আবার তেজস্ক্রিয়।তেজস্ক্রিয়তা বা রেডিওএক্টিভিটি বলতে কি বুঝায়? 'রেডিও' একটি ল্যাটিন শব্দ যার অর্থ হচ্ছে বিকিরণ। রেডিওএক্টিভ আইসোটোপ (রেডিও আইসোটোপ) হচ্ছে সেই আইসোটোপগুলো- যারা কিছু না কিছু বিকিরণ করে।ইলেক্ট্রিক বাল্ব আলো বিকিরণ করে, রেডিয়েটর থেকে বিকিরিত হয় তাপ। রেডিও স্টেশন থেকে বিকিরিত হয় রেডিও ওয়েভ। এখন প্রশ্ন হলো, রেডিওএক্টিভ আইসোটোপ কী বিকিরণ করে?তুমি ইতোমধ্যে জেনে গেছ যে, বোরন-১০ ও বোরন-১১ আইসোটোপ রেডিওএক্টিভ নয়। কিন্তু বোরন-১১ পরমাণুর নিউক্লিয়াসে যদি একটি নিউট্রন যোগ করা হয় তাহলে কি ঘটবে? বোরন-১১ তখন বোরন-১২ তে রূপান্তরিত হবে। হতে পারে নতুন এই আইসোটোপটি রেডিওএক্টিভ!কিন্তু বোরন-১১ পরমাণুর নিউক্লিয়াসে অতিরিক্ত একটি নিউট্রন যোগ করা সম্ভব নয়। কারণ, নিউক্লিয়াসটি তৎক্ষণাৎ ভেঙ্গে পড়বে এবং এটি থেকে প্রতি সেকেন্ডে ২০ হাজার কিলোমিটার বেগে বেরিয়ে আসবে দুইটি প্রোটন ও দুইটি নিউট্রন। এই কণিকাগুলো কিন্তু আলাদা হয়ে বেরিয়ে আসবে না বরং এক সাথে মিলে ছুটে বেরিয়ে আসবে।তেজস্ক্রিয়তা ও কুরি দম্পতির কারিকুরিরেডিও একটি ল্যাটিন শব্দ যার অর্থ হচ্ছে বিকিরণ। রেডিওএক্টিভ আইসোটোপ হচ্ছে সেই আইসোটোপগুলো- যারা কিছু না কিছু বিকিরণ করে।দুইটি প্রোটন ও দুইটি নিউট্রন যখন এক সঙ্গে শক্তভাবে লেগে থাকে পদার্থবিদরা একে অভিহিত করেন আলফা কণিকা হিসেবে। আলফা কণিকার প্রবাহকে বলা হয় আলফা রেডিয়েশন বা আলফা বিকিরণ।আলফা কণিকা বেরিয়ে আসার পর অবশিষ্ট নিউক্লিয়াসে কিছু অদ্ভুত ব্যাপার ঘটতে থাকে। চল, দেখা যাক কি ঘটছে ওখানে।বোরন-১২ পরমাণুর নিউক্লিয়াসে রয়েছে ৫টি প্রোটন ও ৭টি নিউট্রন। দুইটি প্রোটন এবং দুইটি নিউট্রন আলফা কণিকা হয়ে বের হয়ে এলো। এখন কয়টি প্রোটন এবং কয়টি নিউট্রন থেকে গেল?হিসাবটা খুব সোজা- তিনটি প্রোটন এবং পাঁচটি নিউট্রন! বাস্তবে কিন্তু ব্যাপারটি মোটেও এমন নয়। আমরা দেখতে পাচ্ছি চারটি প্রোটন এবং মাত্র চারটি নিউট্রন! কোথা থেকে এলো এই অতিরিক্ত প্রোটন এবং কোথায় হারিয়ে গেল একটি নিউট্রন? আসলে যা ঘটেছে তা হলো একটি নিউট্রন প্রোটনে রূপান্তরিত হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো এই রূপান্তরের সময় অতিরিক্ত একটি ইলেকট্রনেরও উদ্ভব ঘটেছে।নতুন এই ইলেক্ট্রনটির অবস্থান কোথায়? এটির কোন অস্তিত্ব পরমাণুতে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না; কারণ এটি প্রায় আলোর গতিতে ছুটে বেরিয়ে গেছে। আলোর গতি কত জানো কি? প্রতি সেকেন্ডে ৩ লাখ কিলোমিটার!কিছু মৌল তেজস্ক্রিয় হয় কেনদুইটি প্রোটন ও দুইটি নিউট্রন যখন এক সঙ্গে শক্তভাবে লেগে থাকে পদার্থবিদরা একে অভিহিত করেন আলফা কণিকা হিসেবে। আলফা কণিকার প্রবাহকে বলা হয় আলফা রেডিয়েশন বা আলফা বিকিরণ।রেডিওএক্টিভ আইসোটোপের নিউক্লিয়াস থেকে যে ইলেকট্রন উৎপন্ন হয় পদার্থবিদরা তাকে নাম দিয়েছেন বিটা কণিকা। আর বিটা কণিকার প্রবাহকে বলা হয় বিটা রেডিয়েশন। এখন কি দাঁড়ালো? বোরন-১২ আলফা ছাড়া বিটা কণিকাও বিকিরণ করে। কিন্তু এখানেই শেষ নয়!বোরন-১২ পরমাণুর নিউক্লিয়াস ভেঙ্গে যাওয়ার সময় গামা রশ্মিও বিকিরিত হয়। গামা রশ্মির সাথে এক্স-রে রশ্মির অনেক মিল রয়েছে। তোমরা জান যে, এক্স-রে রশ্মি চিকিৎসার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। গামা রশ্মির একটি বিশেষ গুণ হলো যে, এক্স-রের তুলনায় সহজে কোন বাধা ভেদ করে যেতে পারে।আমরা তিন ধরনের রেডিয়েশন সম্পর্কে জানতে পারলাম: আলফা, বিটা, ও গামা। বোরন-১২ থেকে এই তিন ধরনের রেডিয়েশনই পাওয়া যায়। কিন্তু সকল তেজস্ক্রিয় আইসোটোপই এমন নয়, কোনটি হয়তো আলফা রশ্মি, কোনটি বা বিটা রশ্মি বিকিরণ করে থাকে।কোন রেডিও আইসোটোপের সকল পরমাণু নিউক্লিয়াসগুলো এক সঙ্গে ভেঙ্গে যায় না, অল্প কিছুসংখ্যক আস্তে আস্তে ভাঙ্গতে থাকে। এমন একটি সময় আসে যখন ভাঙ্গার মতো এত অল্পসংখ্যক নিউক্লিয়াস অবশিষ্ট থাকে যে, রেডিও আইসোটোপটির অস্তিত্ব আর টের পাওয়া যায় না। কত দ্রুত এই ব্যাপারটি ঘটতে পারে? বোরন-১২ এর বেলায় সময়টি খুবই কম, এক সেকেন্ডের এক শত ভাগের দুই ভাগেরও কম সময় লাগে এটির অর্ধেক পরমাণু ভেঙ্গে যেতে। পরবর্তী একই সময়ের মধ্যে অবশিষ্টাংশের অর্ধেক ভেঙ্গে যায় এবং এভাবেই চলতে থাকে। বলতে গেলে বোরন-১২ এর অস্তিত্ব প্রায় চোখের পলকে বিলুপ্ত হয়ে যায়।রেডিয়েশন শব্দটি যেভাবে এলবোরন-১২ থেকে আলফা, বিটা, ও গামা তিন ধরনের রেডিয়েশনই পাওয়া যায়। কিন্তু সকল তেজস্ক্রিয় আইসোটোপই এমন নয়, কোনটি হয়তো আলফা রশ্মি, কোনটি বা বিটা রশ্মি বিকিরণ করে থাকে।কিন্তু সব রেডিও আইসোটোপের বেলায় এমনটি ঘটে না। অনেক রেডিও আইসোটোপের জীবনকাল যথেষ্ট দীর্ঘ। উদাহরণস্বরূপ, ভারী ধাতু থোরিয়াম-২৩২ এর অর্ধেক পরমাণুর নিউক্লিয়াস ভেঙ্গে যেতে সময় লাগে এক হাজার চারশত কোটি বছর!একটি রেডিও আইসোটোপের অর্ধেক সংখ্যক পরমাণুর নিউক্লিয়াস ভেঙ্গে যেতে যে সময় প্রয়োজন হয় পদার্থবিদদের ভাষায় একে 'হাফ লাইফ' হিসেবে অভিহিত করা হয়।লোহার ৬টি রেডিও আইসোটোপ রয়েছে-যেগুলোর হাফ লাইফ বিভিন্ন: সাড়ে পাঁচ মিনিট, ৯ মিনিট, আট ঘণ্টা, দেড় মাস, আড়াই বছর এবং তিন লাখ বছর। এখন পর্যন্ত আমরা এক হাজারেরও বেশি আইসোটোপের সন্ধান পেয়েছি। এর মধ্যে কিছুসংখ্যক পাওয়া গেছে প্রকৃতি থেকে, অধিকাংশের উৎপত্তি কৃত্রিমভাবে- হয় রিঅ্যাক্টরে বা ল্যাবরেটরিতে।তোমার হয়তো জানতে ইচ্ছে করছে এতদসংক্রান্ত জ্ঞান আমাদের কি উপকারে আসে কিংবা বিজ্ঞানিরা কেনইবা প্রকৃতিতে এ সকল রেডিও আইসোটোপ খুঁজে বেড়াচ্ছেন অথবা কৃত্রিমভাবে উৎপাদন করছেন। একটি উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাক।নিউক্লিয়ার শক্তি ও আইসোটোপএকটি রেডিও আইসোটোপের অর্ধেক সংখ্যক পরমাণুর নিউক্লিয়াস ভেঙ্গে যেতে যে সময় প্রয়োজন হয় পদার্থবিদদের ভাষায় একে হাফ লাইফ হিসেবে অভিহিত করা হয়।আমরা কার্বনের বিষয়ে আলোচনা করেছি। পদার্থটির সঙ্গে প্রায়শই আমাদের সাক্ষাৎ ঘটে। প্রকৃতি থেকে আমরা কার্বনের একটি আইসোটোপ কার্বন-১৪ পেয়ে থাকি। কার্বন-১২ পরমাণুর নিউক্লিয়াসে ৬টি করে প্রোটন ও নিউট্রন থাকে। এর সঙ্গে যদি আরো দুইটি নিউট্রন যুক্ত হয় তবেই আমরা পাব কার্বন-১৪। প্রতিটি গাছপালা, জীবজন্তু ও মানবদেহে রেডিওএক্টিভ কার্বনের উপস্থিতি রয়েছে। প্রত্নতত্ত্ববিদদের জন্য এটি অতি উপকারী একটি তথ্য। ধরে নেই, তারা কাঠের বনফায়ার থেকে কয়লা সংগ্রহ করে গবেষণা করছেন। কার্বনের কয়টি পরমাণুর নিউক্লিয়াস অক্ষত আছে এবং কয়টি ভেঙ্গে গেছে এ তথ্যটির ওপর ভিত্তি করে তারা অত্যন্ত সঠিকভাবে বলে দিতে পারবেন কখন এই বনফায়ারটি সংঘটিত হয়েছিল, কিংবা আমাদের পূর্ব পুরুষরা কত বছর পূর্বে এটি ব্যবহার করেছিলেন।বিস্ময়কর ব্যাপার, তাই না?কৃতজ্ঞতা: রুশ রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি কর্পোরেশন- রোসাটমবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশবাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন এনআইএইপি- এএসই, রাশিয়া এবংপরমাণু শক্তি তথ্য কেন্দ্র, ঢাকাপরমাণুর গঠন কেমনপরমাণু কণিকাগুলোর পারস্পরিক বন্ধননিউক্লিয় বল বলতে কি বুঝায়পারমাণবিক জ্বালানির দহনঅতিরিক্ত নিউট্রন কিভাবে আটকানো যায়
বর্তমান সময়ে আমাদের জাতীয় অর্থনীতি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটে নানামুখী পরিবর্তন ও অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে এবং বিভিন্ন খাতের উন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারি উভয় পক্ষ থেকেই বিভিন্ন যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এসব উদ্যোগ সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের সার্বিক অগ্রযাত্রা আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হবে।
বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট খাতের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশের উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। এই খাতের যথাযথ প্রসার ঘটলে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভিত্তিকে আরও বেশি শক্তিশালী করবে।
সামগ্রিক এই উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে দীর্ঘমেয়ায়ী ও টেকসই করতে হলে সংশ্লিষ্ট সকলের আন্তরিক সহযোগিতা এবং সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা অত্যন্ত জরুরি। আশা করা যাচ্ছে অদূর ভবিষ্যতে এর সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং সাধারণ মানুষ এর প্রকৃত সুফল ভোগ করবে।